ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে ৪০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আটক করে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই আন্দামান সাগরে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ভারতীয় নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত ৬ মে, ২০২৫ তারিখে দিল্লির উত্তম নগর, বিকাশপুরি এবং হাসতসাল এলাকা থেকে এই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আটক করা হয়। তাদের প্রথমে ইন্দরলোক ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে ৮ মে ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি জাহাজে করে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পাঠানো হয়। অভিযোগ, সেখান থেকে তাদের আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।
ঘটনার বিবরণ ও অভিযোগ
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) নিবন্ধিত এই শরণার্থীদের মধ্যে নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও ছিলেন। ভুক্তভোগীদের স্বজনদের দাবি, দিল্লি পুলিশ তাদের জানিয়েছিল যে শুধুমাত্র বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হবে। কিন্তু এরপর তাদের কেউ আর ঘরে ফেরেনি। এক রোহিঙ্গা নারী, আমিনা (ছদ্মনাম), বলেন, “আমার ভাই আমাদের গ্রাম পুড়ে যাওয়ার পর ভারতে এসেছিল। পুলিশ বলেছিল শুধু বায়োমেট্রিক নেবে, সে বিশ্বাস করে চলে যায়। তারপর আর তার কোনো খোঁজ পাইনি।”
ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ (পিইউসিএল) জানিয়েছে, ফেলে দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কিশোর, বয়স্ক এবং ক্যান্সার রোগীরাও ছিলেন। কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, শরণার্থীদের চোখ ও হাত বেঁধে জাহাজে তুলে সমুদ্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাদের লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। ভাগ্যক্রমে, এই ৪০ জন জীবিত অবস্থায় মিয়ানমারের তানিনথারি অঞ্চলের উপকূলে পৌঁছাতে সক্ষম হন। তবে, তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন যে ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের মারধর ও নির্যাতন করেছে।
আইনি লঙ্ঘন ও জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া
ইউএনএইচসিআরের আইন কর্মকর্তা দিলোয়ার হোসাইন জানিয়েছেন, এই শরণার্থীদের ভারতের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালতে পেশ করা হয়নি, যা একটি সুস্পষ্ট আইন লঙ্ঘন। এমনকি নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ জুভেনাইল পুলিশ ইউনিটের ব্যবহারও করা হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুজ এই ঘটনাকে “ভয়ংকর” আখ্যা দিয়ে ভারত সরকারের কাছে বিস্তারিত তথ্য ও সাক্ষ্য প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশন দায়ের করেছে, যাতে তাদের প্রিয়জনদের দিল্লিতে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে, ভারতীয় নৌবাহিনী এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
এক্স-এ জনমত ও বিতর্ক
এই ঘটনা সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ এই ঘটনাকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছেন, আবার কেউ এটিকে ভারত সরকারের “কঠোর পদক্ষেপ” হিসেবে সমর্থন করেছেন। একটি পোস্টে বলা হয়েছে, “মোদি সরকার ৪০ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আন্দামান সাগরে ফেলে দিয়েছে। এমন নিষ্ঠুরতা ইতিহাস মনে রাখবে।” অন্যদিকে, আরেকটি পোস্টে বলা হয়েছে, “ভারত সরকার ৪৩ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের কাছে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে। প্রশংসনীয় কাজ!” এই বিপরীতমুখী মতামত ঘটনার সংবেদনশীলতা এবং জটিলতাকে আরও স্পষ্ট করে।
মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা
রোহিঙ্গা শরণার্থীরা মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার নিবন্ধন থাকা সত্ত্বেও এমন অমানবিক আচরণ গভীর উদ্বেগের বিষয়। ভারত শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার সনদ মেনে চলতে বাধ্য। এই ঘটনা ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে।
উপসংহার
দিল্লি থেকে ৪০ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে সাগরে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। এটি কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ নীতির প্রশ্নই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ভারত সরকারের উচিত এই ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা। একই সঙ্গে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সুরক্ষা ও প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলা এন মিডিয়া ২৪
তারিখ: ১৭ মে, ২০২৫

0 Comments